রাষ্ট্রের বৈধতা, সংবিধানের মর্যাদা এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ: আমরা কোন পথে?
রাষ্ট্রের বৈধতা, সংবিধানের মর্যাদা এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ: আমরা কোন পথে?
বাংলাদেশের জন্ম কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নয়, কোনো রাজপ্রাসাদের চুক্তির মাধ্যমে নয়, কোনো বিদেশি শক্তির দয়ায়ও নয়। এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের সীমাহীন ত্যাগ এবং কোটি মানুষের সংগ্রামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; তার ভিত্তি একটি সংবিধান, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা।
তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি কোনো দলীয় বিতর্ক থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এমন এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার প্রতিটি ধাপ নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতি নিয়ে, অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে, নির্বাচন নিয়ে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে।
একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতেই পারে। সরকার পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পদ্ধতি যদি অস্পষ্ট হয়ে যায়, যদি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রামাণ্য নথি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যদি জনগণ নিশ্চিতভাবে জানতে না পারে কোন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় একটি অধ্যায় শেষ হলো এবং আরেকটি শুরু হলো, তবে সেই অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে।
শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল একটি প্রশ্ন—পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক নথি কোথায়? পরবর্তীকালে এ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে, আবার সেই বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাস গুজব বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; রাষ্ট্রের ইতিহাস দাঁড়ায় নথি, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ওপর।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সমর্থকেরা বলেন, এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির প্রয়োজনীয় সমাধান। সমালোচকেরা বলেন, সংবিধানে এমন ব্যবস্থার স্পষ্ট ভিত্তি ছিল না। উভয় পক্ষের যুক্তি থাকতেই পারে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি অন্যত্র—রাষ্ট্র কি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছিল, যেখানে সংবিধানের প্রচলিত কাঠামো যথেষ্ট ছিল না? যদি তাই হয়, তবে ভবিষ্যতে যেন আর কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তার জন্য কী ধরনের সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন?
পরবর্তী সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু একটি নীতি সব সময় মনে রাখা জরুরি—গণতন্ত্রে বৈধতা শুধু ভোটের ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; বৈধতা আসে পুরো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা থেকে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যদি স্বচ্ছতা থাকে, তবে বিতর্কও অনেক কমে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তিনির্ভর রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণায় এবং পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের দর্শনে যে নীতিগুলো সামনে এনেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল জনগণ। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ; সরকার জনগণের প্রতিনিধি মাত্র। এই মৌলিক সত্য ভুলে গেলে গণতন্ত্র কাগজে-কলমে থাকলেও তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে।
ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যখনই কোনো রাজনৈতিক শক্তি নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করেছে, তখনই গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে। আবার যখনই সংবিধানকে ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে, তখনই রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে। এই শিক্ষা শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাও তাই বলে।
আজ প্রয়োজন একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যেখানে ক্ষমতাসীন হোক বা বিরোধী—সবাই একই সাংবিধানিক মানদণ্ডে বিচারিত হবে। কোনো দল ক্ষমতায় থাকলে এক ধরনের আইন, আর ক্ষমতার বাইরে গেলে আরেক ধরনের ব্যাখ্যা—এই দ্বৈততা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে কেবল ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ নয়। এর অর্থ হলো সত্যকে স্বীকার করার সাহস, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কিন্তু সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা কিন্তু ব্যক্তিপূজার প্রতি নয়; গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কী ধরনের রাষ্ট্র চাই তার ওপর। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে আইন দিয়ে, প্রতিষ্ঠান দিয়ে এবং জনগণের আস্থা দিয়ে। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ, বিচারব্যবস্থা—সবাই সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে কাজ করবে। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নথি জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে হবে না।
কারণ মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—স্বাধীনতা শুধু পতাকা অর্জনের নাম নয়; স্বাধীনতা হলো এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জবাবদিহির আওতায় এবং জনগণই ক্ষমতার একমাত্র উৎস।
আজকের বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন একটি প্রজাতন্ত্র গড়তে পারছি, যেখানে সংবিধানই হবে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব, নাকি আমরা এখনো ব্যক্তি ও পরিস্থিতিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার বৃত্ত থেকে বের হতে পারিনি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কী ধরনের বাংলাদেশ উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে—মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্র, নাকি বারবার রাজনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত একটি রাষ্ট্র।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে আমাদের একটাই অঙ্গীকার করতে হবে—রাষ্ট্রের উপরে কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো দল নয়; সর্বোচ্চ হবে সংবিধান, গণতন্ত্র এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা।
