বাঙালি কি বিজ্ঞানচর্চা করতে পারে না? ইতিহাস বলছে—পারে, এবং বিশ্বকে পথও দেখিয়েছে
বাঙালি বিজ্ঞানচর্চা করতে পারে না—এমন ধারণা ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। বরং উনিশ ও বিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণ এমন এক প্রজন্মের বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও গবেষকের জন্ম দিয়েছিল, যাঁদের আবিষ্কার ও তত্ত্ব আজও বিশ্ববিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁদের অনেকের অবদান আন্তর্জাতিক পরিসরে যথাযথ স্বীকৃতি পেলেও সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
রাধানাথ শিকদার: এভারেস্টের প্রকৃত উচ্চতা নির্ণয়ের নেপথ্যের গণিতবিদ
১৮৫২ সালে বাঙালি গণিতবিদ রাধানাথ শিকদার প্রথম গণনাভিত্তিকভাবে প্রমাণ করেন যে ‘পিক XV’ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। পরবর্তীতে সেটির নামকরণ করা হয় মাউন্ট এভারেস্ট। যদিও পর্বতটির নাম ব্রিটিশ জরিপ কর্মকর্তা জর্জ এভারেস্টের নামে রাখা হয়, ইতিহাসে রাধানাথ শিকদারের অবদান দীর্ঘদিন আড়ালেই থেকে যায়।
জগদীশচন্দ্র বসু: রেডিওবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের অগ্রদূত
স্যার জগদীশচন্দ্র বসু আধুনিক রেডিওবিজ্ঞান ও উদ্ভিদ শারীরবিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি মাইক্রোওয়েভ ও বেতার তরঙ্গ নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করেন এবং উদ্ভিদের সাড়া প্রদর্শনের জন্য ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যের বিকাশেও তাঁর ভূমিকা অনন্য।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়: ভারতীয় রসায়নের জনক
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় শুধু একজন বিশ্বমানের রসায়নবিদই নন, তিনি ছিলেন আধুনিক দেশীয় শিল্পেরও পথপ্রদর্শক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস উপমহাদেশের প্রথম দেশীয় রাসায়নিক ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
মেঘনাদ সাহা: নক্ষত্রের ভাষা যিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন
মেঘনাদ সাহা প্রণয়ন করেন বিখ্যাত সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ, যা নক্ষত্রের তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠন ব্যাখ্যায় বিপ্লব ঘটায়। আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে এই তত্ত্ব আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু: যার নামে মহাবিশ্বের অর্ধেক কণা
১৯২৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের যে গবেষণাপত্র আইনস্টাইন সম্প্রসারণ করেন, সেটিই আজ বোস–আইনস্টাইন পরিসংখ্যান নামে পরিচিত। তাঁর সম্মানেই মৌলিক কণার একটি বৃহৎ শ্রেণির নাম বোসন (Boson)। হিগস বোসনসহ অসংখ্য কণার নামের সঙ্গে তাই চিরস্থায়ী হয়ে আছে এক বাঙালির নাম।
উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী: লক্ষ লক্ষ প্রাণের রক্ষক
ড. উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী কালাজ্বরের কার্যকর ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদান রাখেন। তাঁর গবেষণার ফলে তৎকালীন ভয়াবহ কালাজ্বর মহামারিতে অগণিত মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছিল।
কেদারনাথ দাস: মাতৃস্বাস্থ্যের উদ্ভাবক
প্রসূতি চিকিৎসক কেদারনাথ দাস উদ্ভাবন করেন বেঙ্গল ফোরসেপস, যা নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিভা চৌধুরী: বাঙালি নারী বিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত
বিভা চৌধুরী ছিলেন উপমহাদেশের প্রথম সারির নারী পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন। মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে স্বীকৃত।
আরও যাঁদের অবদান স্মরণীয়
বাঙালি বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আরও উজ্জ্বল নাম রয়েছেন—ড. কুদরত-ই-খুদা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, নীলরতন ধর, নীলরতন সরকার, স্নেহময় দত্ত, দেবেন্দ্রমোহন বসু, নগেন্দ্র চন্দ্র নাগ, নিখিল রঞ্জন সেনসহ আরও অনেকে। তাঁদের গবেষণা রসায়ন, গণিত, পরিসংখ্যান, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানের বিকাশে মৌলিক ভূমিকা রেখেছে।
উপসংহার
“বাঙালি বিজ্ঞানচর্চা করতে পারে না”—এই ধারণা ইতিহাসের কাছে টেকে না। একসময় এই ভূখণ্ড থেকেই উঠে এসেছিলেন এমন সব বিজ্ঞানী, যাঁদের কাজ বিশ্ববিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দিয়েছে। আজ প্রয়োজন তাঁদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলা এবং গবেষণার সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে পুনর্জাগরিত করা।
ছবিতে: বাঙালি নবজাগরণের কয়েকজন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী ও গবেষক, যাঁদের কর্ম বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
শুদ্ধস্বর
মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনের নির্বাচিত বইয়ের বিশ্বস্ত ঠিকানা।
www.shuddhaswar.com�

gw7ejo