ভারতের রাজনীতি, গান্ধী-নেহেরু পরিবার ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় প্রথমেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন— মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কন্যা। তাঁর স্বামী ফিরোজ গান্ধীর পদবি থেকেই “গান্ধী” নামটি এসেছে। সেই সূত্রেই রাজীব গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী—সকলেই “গান্ধী” পদবি ব্যবহার করেন; তবে তাঁদের বংশপরিচয় নেহেরু-গান্ধী রাজনৈতিক পরিবারের ধারাবাহিকতার অংশ, মহাত্মা গান্ধীর রক্তসম্পর্কের নয়।
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বিজেপি—এই দুই দল দীর্ঘদিন ধরে আদর্শ, নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী ও সাংবিধানিক রাজনীতির পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। অন্যদিকে বিজেপি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। এই মতপার্থক্য ভারতের গণতন্ত্রের একটি বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
রাহুল গান্ধী বর্তমানে ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলন, প্রতিবাদ ও জনসমাবেশে তাঁর উপস্থিতি গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। একইভাবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও কংগ্রেসের সক্রিয় রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। কোনো আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ—এটিকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই মূল্যায়ন করা উচিত।
নেহেরু-গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনি বেদনাবিধুরও। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৯১ সালে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। সঞ্জয় গান্ধী ১৯৮০ সালে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এসব ঘটনা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
২০০৪ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করলেও সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী না হয়ে ড. মনমোহন সিংকে সেই দায়িত্ব অর্পণ করেন। ভারতীয় রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আলোচিত হয়।
ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—দায়িত্ববোধের প্রশ্নে পদত্যাগের ঐতিহ্য। ১৯৫৬ সালে বড় রেল দুর্ঘটনার পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে রেল দুর্ঘটনার পর নীতীশ কুমারও পদত্যাগ করেন। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন পদত্যাগ করেন। এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
ভারতের সংবিধান ধর্ম, বর্ণ ও ভাষা নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। বাস্তবে নানা বৈষম্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালে। ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে এবং সেই ধারাবাহিকতা থেকেই ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনোত্তর ভারতের ইতিহাসে এই দুই রাজনৈতিক ধারার প্রতিযোগিতাই জাতীয় রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আন্দোলন, সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা স্বাভাবিক। একইভাবে সরকার পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথও নির্ধারিত থাকে নির্বাচন ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে একই দলের সংসদীয় দল নতুন নেতা নির্বাচন করতে পারে এবং রাষ্ট্রপতি তাঁকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। ফলে একজন ব্যক্তির পদত্যাগ মানেই সরকারের অবসান নয়—সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতাই এখানে মূল বিষয়।
রাজনীতি নিয়ে মতভেদ থাকবে, বিতর্কও থাকবে। কিন্তু ইতিহাস, সংবিধান ও তথ্যভিত্তিক আলোচনাই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিত্তি। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষ নয়, বরং তথ্য, যুক্তি ও ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠই সমাজকে সমৃদ্ধ করে।
— শুদ্ধস্বর
