মুক্তচিন্তা

গুজবের রাজ্যে যুক্তির নির্বাসন


​সবচেয়ে সহজ কাজ কী জানেন? একজন মানুষকে না পড়ে ঘৃণা করা। ইতিহাস না জেনে তা অস্বীকার করা। রাষ্ট্রের গভীরে না গিয়েই তাকে ভেঙে ফেলার দিবাস্বপ্ন দেখা।
​আর সবচেয়ে কঠিন কাজ? ধৈর্য ধরে প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করা।
​আমরা আজ এমন এক গোলকধাঁধায় বাস করছি, যেখানে সত্যের চেয়ে আবেগের ওজন বেশি। একটি ফরোয়ার্ড করা বার্তা, কাটছাঁট করা ভিডিও কিংবা চটকদার রাজনৈতিক স্লোগান—আমাদের কাছে শত গবেষণাপত্র বা বাস্তব তথ্যের চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।
​তারপরই জনতা রাস্তায় নামে। স্লোগান ওঠে। ক্রোধের আগুনে পুড়তে থাকে বিবেক। সেখানে ইতিহাসের স্থান দখল করে নেয় সাময়িক উত্তেজনা।
​প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সাহস
​বিপ্লবের উন্মাদনা যখন স্তিমিত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে:
​যে পাহাড়সম দুর্নীতির দোহাই দিয়ে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বিচার কোথায়?
​যে মাফিয়া রাষ্ট্রের বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তার আইনি নিষ্পত্তি কতদূর?
​হাজারো অভিযোগের ওপর দাঁড়িয়ে যে জনরোষ তৈরি করা হলো, তার তথ্যভিত্তিক উপসংহার কেন আজও অদৃশ্য?
​মনে রাখবেন, প্রশ্ন করলেই যদি কাউকে কোনো নির্দিষ্ট দলের তকমা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে মুক্তচিন্তার কফিন সেদিনই তৈরি হয়ে যায়।
​সমালোচনামূলক চিন্তার সংকট
​বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়; আমাদের আসল সংকট হলো ‘সমালোচনামূলক চিন্তার’ (Critical Thinking) অভাব। আমরা এখন বই পড়ার চেয়ে বক্তৃতা শুনতে পছন্দ করি। গবেষণার চেয়ে গুজব ছড়াতে বেশি তৃপ্তি পাই। ইতিহাসের পাতার চেয়ে ‘হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়’ বা ফেসবুকের দেওয়ালকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করি। ফলে আমরা বারবার অন্যের বর্ণনায় নিজের দেশকে দেখছি, নিজের বিচারবোধ বা নিজস্ব দর্শন দিয়ে নয়।
​আমাদের দায়বদ্ধতা
​১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছিল স্বাধীনতার মূল্য। কিন্তু স্বাধীনতা শুধু ভূখণ্ডের সীমানা নয়, এটি চিন্তার মুক্তি। যে জাতি প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে জাতি খুব সহজেই প্রচারণার শিকারে পরিণত হয়। যে জাতি বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে জাতি অন্য কারো ইশারায় পরিচালিত হয়। আর যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি ইতিহাসের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়।
​আজ কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নয়, বরং একটি নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে বলছি—
স্লোগানের আগে বই খুলুন। প্রচারণার আগে তথ্যের সত্যতা খুঁজুন। ঘৃণার আগে ইতিহাস জানুন। আর জনতার উল্লাসে গা ভাসানোর আগে নিজের বিবেককে একবার নিভৃতে প্রশ্ন করুন।

​রাষ্ট্র ধ্বংস করতে কয়েকটি ঘণ্টা বা একটি হুজুগই যথেষ্ট, কিন্তু একটি সভ্য, যুক্তিবাদী ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে লাগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
শুদ্ধস্বরের লড়াই গুজব নয়, জ্ঞানের পক্ষে; অন্ধ আনুগত্য নয়, যুক্তির পক্ষে; আর বিভাজন নয়, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের পক্ষে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *